logo

শিরোনাম

পাল্টাপাল্টি কর্মসূচিতে মুন্সীগঞ্জের সংস্কৃতি অঙ্গন, সংকট কি সংস্কৃতির নাকি আস্থা

নিউজ সেভেন্টি ওয়ান ডট টিভি ডেস্ক
প্রতিবেদন প্রকাশ: ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ | সময়ঃ ১২:০০
photo
ছবি এ আই

নিজস্ব প্রতিনিধি: সংস্কৃতি মানুষের মধ্যে বিভাজন তৈরি করে না—বরং বিভাজনের দেয়াল ভাঙে। গান, নাটক, আবৃত্তি, সাহিত্য কিংবা শিল্পচর্চার মূল শক্তিই হলো মানুষকে কাছাকাছি নিয়ে আসা। কিন্তু সেই সাংস্কৃতিক অঙ্গনেই যদি সংবাদ প্রকাশকে কেন্দ্র করে পাল্টাপাল্টি মানববন্ধন, অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ এবং রাজনৈতিক পরিচয়ের প্রশ্ন সামনে চলে আসে, তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে—মুন্সীগঞ্জের সংস্কৃতি অঙ্গন কোন দিকে যাচ্ছে?


সাম্প্রতিক কয়েক দিনের ঘটনাপ্রবাহে সেই প্রশ্নই সামনে এসেছে। একটি সম্মাননা আয়োজনকে ঘিরে সংবাদ প্রকাশ, সংবাদটির প্রতিবাদে সংস্কৃতিকর্মীদের মানববন্ধন এবং পরদিন সাংবাদিক ও তাঁর পরিবারের মানহানির অভিযোগে পাল্টা মানবপ্রাচীর—সব মিলিয়ে বিষয়টি এখন আর কেবল একটি সংবাদ কিংবা একটি সম্মাননা অনুষ্ঠানকে ঘিরে নেই। এর প্রভাব পড়েছে বৃহত্তর সাংস্কৃতিক সমাজে। বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে সাধারণ মানুষের মধ্যেও। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কয়েক দিন ধরে চলছে নানা মন্তব্য, পাল্টা মন্তব্য ও বিতর্ক।


ঘটনার সূত্রপাত ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, দৈনিক যুগান্তরের মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত ‘মুন্সীগঞ্জে ফ্যাসিবাদের দোসরদের দেওয়া হচ্ছে শিল্পকলা সম্মাননা’ শিরোনামের প্রতিবেদনকে কেন্দ্র করে। প্রতিবেদনে ২০১৯ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত সাংস্কৃতিক অঙ্গনে অবদানের জন্য জেলা শিল্পকলা একাডেমির সম্মাননা আয়োজন নিয়ে বিভিন্ন অভিযোগ তুলে ধরা হয়।

 অভিযোগ ছিল, সাবেক সরকারের সময়ে সুবিধাভোগী বা বিতর্কিত হিসেবে পরিচিত কিছু ব্যক্তিকে সম্মাননা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। জেলা শিল্পকলা একাডেমির সম্মাননা নিয়ে এমন অভিযোগ প্রকাশের পরই বিষয়টি সাংস্কৃতিক অঙ্গনে আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসে। 


অন্যদিকে, ১৩ সেপ্টেম্বর রোববার, ‘শিল্পী সমাজ, মুন্সীগঞ্জ’-এর ব্যানারে জেলার সংস্কৃতিকর্মীরা মানববন্ধন ও প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করেন। তাঁদের বক্তব্য, প্রকাশিত প্রতিবেদনে যথাযথ তথ্য যাচাই না করে সাংস্কৃতিক অঙ্গনের একটি অংশকে ‘ফ্যাসিবাদের দোসর’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। তাঁদের দাবি, ২০১৯ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত শিল্প ও সংস্কৃতি অঙ্গনে বিশেষ অবদান রাখা গুণী শিল্পী, সংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও সংগঠনকে বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে সম্মাননা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। জেলা শিল্পকলা একাডেমির ব্যবস্থাপনায় এবং জেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় ৩৫ জনকে সম্মাননা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল বলেও তাঁরা জানান। সংবাদ প্রকাশের পর বন্ধ করে দেয়া হয় সম্মাননা প্রদান অনুষ্ঠানটি। 

সংস্কৃতিকর্মীদের অভিযোগ, একটি সংবাদে একটি বৃহৎ সাংস্কৃতিক অঙ্গনের মানুষকে একটি রাজনৈতিক পরিচয়ে চিহ্নিত করার ফলে তাঁদের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মর্যাদা ক্ষুণ্ন হয়েছে। তাঁরা সংবাদটির ব্যাখ্যা ও প্রতিবাদ প্রকাশ, ঘটনার তদন্ত এবং প্রতিবেদকের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান। তাঁদের বক্তব্যের মূল জায়গাটি ছিল—কোনো ব্যক্তির রাজনৈতিক পরিচয় বা অতীত কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন থাকলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বক্তব্য নেওয়া এবং তথ্য-প্রমাণ যাচাই করে সংবাদ প্রকাশ করা সাংবাদিকতার দায়িত্ব। 
কিন্তু এর পরদিনই তৈরি হয় পাল্টা পরিস্থিতি।


১৪ সেপ্টেম্বর সোমবার দুপুরে, মুন্সীগঞ্জ প্রেসক্লাবের ফটকে ‘নাগরিক সমাজ’-এর ব্যানারে মানবপ্রাচীর অনুষ্ঠিত হয়। এই কর্মসূচিতে অভিযোগ করা হয়, সাংস্কৃতিক কর্মীদের সম্মাননার তালিকা নিয়ে সংবাদ প্রকাশের পর সাংবাদিক ও তাঁর পরিবারের বিরুদ্ধে মানহানিকর বক্তব্য দেওয়া হচ্ছে। কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের বক্তব্য ছিল—কোনো সংবাদ নিয়ে আপত্তি থাকলে তার প্রতিবাদ বা জবাব দেওয়ার প্রাতিষ্ঠানিক ও আইনগত পথ রয়েছে; কিন্তু সাংবাদিক কিংবা তাঁর পরিবারের বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত আক্রমণ গ্রহণযোগ্য নয়। পাল্টা কর্মসূচিতে আরও অভিযোগ করা হয়, শিল্পকলা একাডেমির অনিয়ম, দুর্নীতি এবং রাজনৈতিক প্রভাবের বিষয়গুলোও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। তাঁদের দাবি, সাংস্কৃতিক অঙ্গনকে রাজনৈতিক প্রভাব ও দুর্নীতিমুক্ত রাখতে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। 


অর্থাৎ, এক পক্ষের অভিযোগ—সংবাদে সংস্কৃতিকর্মীদের অন্যায্যভাবে রাজনৈতিক তকমা দেওয়া হয়েছে; অন্য পক্ষের অভিযোগ—সেই সংবাদকে কেন্দ্র করে সাংবাদিক ও তাঁর পরিবারকে হেয় করা হচ্ছে। দুই পক্ষের বক্তব্যই গুরুতর। আর এ কারণেই প্রয়োজন আবেগ নয়, তথ্যের ভিত্তিতে বিষয়টির নিষ্পত্তি।সবচেয়ে উদ্বেগের জায়গাটি অবশ্য অন্যত্র। এই পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি এখন শুধু সংস্কৃতিকর্মীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যেও নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। কে সঠিক, কার অভিযোগের ভিত্তি কতটা শক্ত, সম্মাননা বাছাইয়ের প্রক্রিয়া কতটা স্বচ্ছ, সংবাদে তথ্য যাচাই কতটা হয়েছে—এসব প্রশ্নের উত্তর না পেয়ে অনেকেই মন্তব্যের মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান জানাচ্ছেন। ফলে যে সাংস্কৃতিক অঙ্গন মানুষের মধ্যে সৌহার্দ্য তৈরি করার কথা, সেখানে তৈরি হচ্ছে সন্দেহ ও বিভ্রান্তি।


এখানে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি—একটি আগুন নেভাতে দেরি হলে যেমন আগুন শুধু একটি ঘরেই থাকে না, তেমনি সংস্কৃতির অঙ্গনে তৈরি হওয়া অবিশ্বাসও কেবল একটি ঘটনার মধ্যে আটকে থাকে না। আজ একজনকে নিয়ে প্রশ্ন উঠছে, কাল আরেকজনকে নিয়ে উঠতে পারে। আজ একটি সম্মাননা স্থগিত হয়েছে, ভবিষ্যতে হয়তো কোনো শিল্পী সম্মাননা গ্রহণের আগেই ভাববেন—এই স্বীকৃতির সঙ্গে আবার কোনো রাজনৈতিক বিতর্ক জুড়ে যাবে কি না। এর প্রভাব পড়তে পারে নতুন প্রজন্মের ওপরও। একজন তরুণ শিল্পী যখন দেখবে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের চেয়ে রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে বিতর্ক বেশি, তখন তার মধ্যে সংস্কৃতি চর্চার আগ্রহ কমতে পারে। কোনো সংগঠন নতুন কর্মসূচি নিতে গিয়ে দ্বিধায় পড়তে পারে। অভিভাবকেরাও সন্তানকে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করার ক্ষেত্রে প্রশ্ন তুলতে পারেন। আর দীর্ঘদিনের এই অবিশ্বাস একসময় সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর পারস্পরিক সহযোগিতার জায়গাটিকেও দুর্বল করে দিতে পারে।
তাই এই মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সংঘাত নয়, সংলাপ। সংবাদে ভুল থাকলে সংশোধন ও প্রতিবাদের সুযোগ আছে। সাংবাদিকের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে গণমাধ্যমের নিজস্ব জবাবদিহি, প্রেস কাউন্সিল কিংবা আইনগত প্রক্রিয়ার পথ রয়েছে। আবার কোনো সম্মাননা তালিকা নিয়ে প্রশ্ন থাকলে মনোনয়ন প্রক্রিয়া, বাছাইয়ের মানদণ্ড, কমিটির সিদ্ধান্ত ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্র প্রকাশ করে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা সম্ভব। প্রতিবাদ থাকবে, প্রশ্ন থাকবে, সমালোচনাও থাকবে—কিন্তু ব্যক্তিগত আক্রমণ কিংবা রাজনৈতিক তকমা যেন সংস্কৃতির ভাষা না হয়ে ওঠে।


আর প্রশাসনেরও এখানে দায়িত্ব আছে। একটি সম্মাননা আয়োজন নিয়ে যখন প্রশ্ন উঠেছে, তখন স্বচ্ছতার স্বার্থে পুরো প্রক্রিয়াটি স্পষ্ট করা উচিত। একই সঙ্গে সংবাদ প্রকাশ নিয়ে অভিযোগ উঠলে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্য যাচাই করে সত্য-মিথ্যা আলাদা করাও জরুরি। কারণ মুন্সীগঞ্জের সংস্কৃতি অঙ্গন কোনো ব্যক্তি, কোনো সংগঠন কিংবা কোনো একটি সময়ের সম্পত্তি নয়। বহু বছরের শিল্পী, নাট্যকর্মী, আবৃত্তিশিল্পী, সংগীতশিল্পী, সাহিত্যকর্মী ও সাংস্কৃতিক সংগঠকদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এই অঙ্গন গড়ে উঠেছে। আজকের পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি হয়তো কয়েক দিনের ঘটনা। কিন্তু এর দৃষ্টান্ত যদি স্থায়ী হয়ে যায়, তাহলে আগামী দিনের সাংস্কৃতিক চর্চায় এর ছায়া দীর্ঘ হতে পারে। একটি ভুল নজির ধীরে ধীরে অভ্যাসে পরিণত হয়—আর অভ্যাস যখন সংস্কৃতির অংশ হয়ে যায়, তখন তা ভাঙা কঠিন। মুন্সীগঞ্জের সংস্কৃতি অঙ্গনের সামনে তাই এখন সবচেয়ে বড় পরীক্ষা—কে জিতল, কে হারল, সেটি নয়; বরং সংস্কৃতি যেন হেরে না যায়।
বিতর্কের মীমাংসা হোক তথ্য দিয়ে, অভিযোগের নিষ্পত্তি হোক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে, সাংবাদিকতার জবাবদিহি থাকুক সাংবাদিকতার নিয়মে, আর সাংস্কৃতিক অঙ্গন ফিরে যাক তার মূল জায়গায়—সৃজনশীলতা, মানবিকতা ও মানুষের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরির জায়গায়।

  • নিউজ ভিউ 162