
নিউজ সেভেন্টি ওয়ান ডট টিভি ডেস্ক
ভাষা, আত্মবিশ্বাস ও মানবিক মূল্যবোধ গড়ার একটি কার্যকর শিক্ষা
নিজস্ব প্রতিবেদক: বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা মূলত ফলাফলকেন্দ্রিক। ভালো নম্বর, প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকা—এই লক্ষ্যেই শিশুরা ব্যস্ত থাকে।
তিনি মনে করেন, আবৃত্তি শিশুকে শুধু কবিতা পাঠ শেখায় না; বরং ভাষা, চিন্তা ও আত্মপ্রকাশের ভিত তৈরি করে, যা তাকে শিক্ষাজীবন ও ভবিষ্যৎ পেশাগত জীবনে এগিয়ে রাখে।
শুদ্ধ উচ্চারণে গড়ে ওঠে ভাষার ভিত্তি
আবৃত্তির প্রথম ও প্রধান শিক্ষা হলো শুদ্ধ ও প্রমিত উচ্চারণ। একটি কবিতার ভাব ও ছন্দ সঠিকভাবে প্রকাশ করতে হলে শব্দের সঠিক উচ্চারণ অপরিহার্য। ছোটবেলা থেকে নিয়মিত আবৃত্তিচর্চা করলে শিশুরা স্বাভাবিকভাবেই আঞ্চলিকতার প্রভাব কাটিয়ে প্রমিত বাচনভঙ্গিতে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে। এই অভ্যাস ভাষাগত দক্ষতা বাড়ানোর পাশাপাশি অন্যান্য ভাষা শেখার ক্ষেত্রেও সহায়ক ভূমিকা রাখে।
আত্মবিশ্বাস ও প্রকাশক্ষমতার বিকাশ
অনেক শিশুই জনসমক্ষে কথা বলতে সংকোচ বোধ করে। আবৃত্তি সেই জড়তা ভাঙার একটি কার্যকর অনুশীলন। মঞ্চে দাঁড়িয়ে কবিতা উপস্থাপনের মধ্য দিয়ে শিশুরা নিজের কথা বলতে শেখে, আত্মবিশ্বাস অর্জন করে এবং ধীরে ধীরে সাবলীলভাবে ভাব প্রকাশে সক্ষম হয়। ভবিষ্যতে শিক্ষাজীবন, বিতর্ক, উপস্থাপনা কিংবা পেশাগত যোগাযোগে এই দক্ষতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
শব্দভান্ডার ও সৃজনশীল চিন্তার বিস্তার
কবিতা ও ছড়ার মাধ্যমে শিশুরা নতুন শব্দ, বাক্যগঠন ও সাহিত্যিক ভাষার সঙ্গে পরিচিত হয়। এতে তাদের শব্দভান্ডার সমৃদ্ধ হয় এবং ভাষার প্রতি আগ্রহ বাড়ে। একই সঙ্গে কবিতার ভাব, ছন্দ ও অলংকার অনুধাবনের প্রক্রিয়ায় শিশুর কল্পনাশক্তি ও সৃজনশীল চিন্তা বিকশিত হয়, যা পড়াশোনার অন্যান্য বিষয়েও ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।
স্মৃতিশক্তি ও মনোযোগে ইতিবাচক প্রভাব
একটি কবিতা মুখস্থ করা এবং আবেগসহ তা উপস্থাপন করা স্মৃতিশক্তি ও মনোযোগ বৃদ্ধির একটি কার্যকর উপায়। আবৃত্তির সময় কবিতার অর্থ বুঝে নেওয়া, ছন্দ ঠিক রাখা ও শ্বাস-প্রশ্বাস নিয়ন্ত্রণ—সব মিলিয়ে শিশুর একাগ্রতা বাড়ে। নিয়মিত এই চর্চা মস্তিষ্কের কার্যকারিতা বৃদ্ধি করে এবং শেখার ক্ষমতা জোরদার করে।
মানবিক ও নৈতিক শিক্ষার অনুশীলন
সাহিত্য, বিশেষ করে কবিতা, মানবতা, দেশপ্রেম, প্রকৃতিপ্রেম ও নৈতিকতার গভীর বার্তা বহন করে। আবৃত্তির মাধ্যমে শিশুরা এসব মানবিক মূল্যবোধের সঙ্গে পরিচিত হয়। ভালো কবিতার ভাবধারা শিশুদের মনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে এবং তাদের সংবেদনশীল ও নৈতিক মানুষ হিসেবে গড়ে উঠতে সহায়তা করে।
আবৃত্তি ও স্বাস্থ্যবিজ্ঞানের দৃষ্টিভঙ্গি
স্বাস্থ্যবিজ্ঞানীদের মতে, আবৃত্তি একধরনের মানসিক থেরাপি হিসেবেও কাজ করে। কবিতা মুখস্থ ও আবৃত্তির সময় মস্তিষ্কের ভাষা ও স্মৃতিসংশ্লিষ্ট অংশ সক্রিয় হয়, ফলে স্নায়বিক সংযোগ শক্তিশালী হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত মুখস্থ করার অভ্যাস বার্ধক্যজনিত স্মৃতিভ্রম বা ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি কমাতে সহায়ক হতে পারে। আবৃত্তির সময় ছন্দ ও শ্বাস-প্রশ্বাসের নিয়ন্ত্রিত ব্যবহার মানসিক চাপ কমায়। এতে মস্তিষ্কে এন্ডোরফিন ও সেরোটোনিনের মতো সুখের হরমোন নিঃসৃত হয়, যা উদ্বেগ ও স্ট্রেস কমাতে সাহায্য করে। এ কারণেই মনোরোগ চিকিৎসায় ‘পোয়েট্রি থেরাপি’ বা ‘গ্রন্থ চিকিৎসা’ একটি সহায়ক পদ্ধতি হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
শিক্ষাজীবন ও ক্যারিয়ারে এক ধাপ এগিয়ে রাখে
আবৃত্তিচর্চা শিশুকে শব্দভান্ডার, আত্মবিশ্বাস, বক্তৃতা দক্ষতা ও নেতৃত্বের গুণাবলি অর্জনে সহায়তা করে। বড় হয়ে তারা সভা-সমাবেশ, ক্লাস প্রেজেন্টেশন, অফিস মিটিং কিংবা জনসম্মুখে বক্তব্য রাখতে বেশি আত্মবিশ্বাসী হয়। একই সঙ্গে মানবিক ও সামাজিক দায়িত্ববোধসম্পন্ন ব্যক্তি হিসেবে নিজেদের গড়ে তুলতে সক্ষম হয়।
মানবিক ও নৈতিক শিক্ষার ভূমিকা সাহিত্য ও কবিতা মানবতা, দেশপ্রেম, প্রকৃতিপ্রেম ও নৈতিকতার বার্তা বহন করে। আবৃত্তির মাধ্যমে শিশুরা এসব মূল্যবোধের সঙ্গে পরিচিত হয় এবং সংবেদনশীল মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠে। এই মানবিক শিক্ষা তাদের সামাজিক ও পেশাগত জীবনেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।
আবৃত্তি শেখানো মানে কেবল একটি শিল্প শেখানো নয়; এটি শিশুদের ভাষা, মনন, অনুভূতি ও চরিত্র গঠনের একটি পূর্ণাঙ্গ শিক্ষা। পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি আবৃত্তিচর্চা শিশুদের মানসিক সুস্থতা, মানবিক মূল্যবোধ এবং ভবিষ্যৎ পেশাগত দক্ষতা গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই একটি আত্মবিশ্বাসী, সংবেদনশীল ও যোগ্য প্রজন্ম গড়ে তুলতে শিক্ষার সঙ্গে আবৃত্তিচর্চাকে যুক্ত করা সময়ের দাবি।