নিউজ সেভেন্টি ওয়ান ডট টিভি ডেস্ক
নিজস্ব প্রতিবেদক:
সরকারি খাস জমি লিজ বা বন্দোবস্ত নিয়ে বসতবাড়ি, কৃষিকাজ, ব্যবসা কিংবা নির্দিষ্ট কোনো উন্নয়নমূলক কাজে ব্যবহার করতে চান অনেকেই। তবে ইচ্ছা করলেই সরকারি খাস জমি লিজ নেওয়া যায় না।
জমির শ্রেণি, আবেদনকারীর যোগ্যতা, ব্যবহারের উদ্দেশ্য এবং সরকারের প্রচলিত নীতিমালা অনুযায়ী যাচাই-বাছাই শেষে অনুমোদন পাওয়া যায়।
ভূমি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, সরকারি খাস জমির ক্ষেত্রে কৃষি ও অকৃষি—দুই ধরনের ব্যবস্থাপনা ও বন্দোবস্ত নীতিমালা রয়েছে। কৃষি খাসজমির জন্য ‘কৃষি খাসজমি ব্যবস্থাপনা ও বন্দোবস্ত নীতিমালা, ১৯৯৭’ এবং অকৃষি খাসজমির জন্য ‘অকৃষি খাসজমি ব্যবস্থাপনা ও বন্দোবস্ত নীতিমালা, ১৯৯৫’ কার্যকর রয়েছে।
খাস জমি কী?
সরকারের মালিকানাধীন ও নিয়ন্ত্রণাধীন যে জমি নির্দিষ্ট নীতিমালা অনুযায়ী বন্দোবস্ত বা অন্যভাবে ব্যবহারের জন্য দেওয়া যেতে পারে, সাধারণভাবে তাকে সরকারি খাস জমি বলা হয়।
তবে সব সরকারি জমি লিজ বা বন্দোবস্তযোগ্য নয়। রাস্তা, খাল, ঘাট, নদী, জনসাধারণের ব্যবহার্য স্থানসহ বিভিন্ন ধরনের জমি বিশেষ বিধিনিষেধের আওতায় থাকতে পারে। তাই প্রথমেই সংশ্লিষ্ট জমিটি আসলেই বন্দোবস্তযোগ্য খাস জমি কি না, তা যাচাই করা জরুরি।
কৃষি খাস জমি কারা পেতে পারেন?
কৃষি খাস জমির বন্দোবস্ত মূলত ভূমিহীন ও ভূমিহীনতার নির্ধারিত শ্রেণির মানুষের জন্য। স্থানীয় সরকারি তথ্যসেবায় প্রচলিত আবেদন ফরমে দুঃস্থ মুক্তিযোদ্ধা পরিবার, নদীভাঙন পরিবার, সক্ষম পুত্রসহ বিধবা বা স্বামী পরিত্যক্তা পরিবার, কৃষি জমি ও বাস্তুভিটাহীন পরিবার এবং অল্প বসতভিটা থাকলেও কৃষিজমি নেই—এ ধরনের শ্রেণির উল্লেখ রয়েছে।
অর্থাৎ সাধারণ ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে কৃষি খাস জমি নেওয়া এবং ভূমিহীন হিসেবে কৃষি খাস জমির বন্দোবস্ত পাওয়া—এক বিষয় নয়।
অকৃষি খাস জমি নিতে হলে
বসতবাড়ি, প্রতিষ্ঠান, শিল্প, ব্যবসা বা অন্য কোনো অকৃষি উদ্দেশ্যে সরকারি খাস জমি বন্দোবস্তের ক্ষেত্রে অকৃষি খাসজমি ব্যবস্থাপনা ও বন্দোবস্ত নীতিমালা, ১৯৯৫ অনুসরণ করা হয়।
ভূমি মন্ত্রণালয়ের নাগরিক সেবা তথ্য অনুযায়ী, অকৃষি খাসজমি বন্দোবস্তের ক্ষেত্রে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে নথি প্রস্তুত করে প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয় এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদনক্রমে বন্দোবস্ত আদেশ জারি করা হয়।
আবেদন করতে সাধারণত কী কী লাগে?
জমির ধরন ও উদ্দেশ্য অনুযায়ী কাগজপত্রে পার্থক্য হতে পারে। তবে সাধারণভাবে প্রস্তুত রাখতে হয়—
১. নির্ধারিত আবেদনপত্র বা আবেদনপত্র।
২. জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি।
৩. নাগরিকত্ব সনদ।
৪. প্রয়োজন অনুযায়ী ভূমিহীনতার সনদ।
৫. আবেদনকারীর ছবি/পরিবারের ছবি—প্রযোজ্য ক্ষেত্রে।
৬. যে জমি চাওয়া হচ্ছে তার মৌজা, দাগ ও খতিয়ানসংক্রান্ত তথ্য।
৭. জমিটি কী কাজে ব্যবহার করা হবে তার বিস্তারিত বিবরণ।
৮. প্রয়োজনীয় অঙ্গীকারনামা/হলফনামা।
৯. নির্ধারিত কোর্ট ফি ও অন্যান্য সরকারি ফি।
১০. আবেদনকারীর যোগ্যতা প্রমাণের প্রয়োজনীয় অন্যান্য কাগজপত্র।
জেলা প্রশাসনের প্রকাশিত সেবা তথ্যেও কৃষি খাসজমির ক্ষেত্রে নির্ধারিত ফরম, পরিবারের যৌথ ছবি, নাগরিক সনদ, ভূমিহীন সনদ ও জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি এবং অকৃষি খাসজমির ক্ষেত্রে সাদা কাগজে আবেদন ও অঙ্গীকারনামার কথা উল্লেখ রয়েছে। তবে ফি ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র স্থানীয় নির্দেশনা বা সংশোধিত নীতিমালা অনুযায়ী পরিবর্তিত হতে পারে, তাই আবেদন করার আগে সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিসে সর্বশেষ তালিকা যাচাই করা উচিত।
কোথায় আবেদন করতে হবে?
সাধারণভাবে প্রথমে সংশ্লিষ্ট উপজেলা ভূমি অফিস/সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয় অথবা সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসনের ভূমি শাখায় যোগাযোগ করতে হয়।
কৃষি খাসজমির ক্ষেত্রে আবেদন পাওয়ার পর সরেজমিনে তদন্ত ও যাচাই করা হয়। এরপর প্রস্তাব/প্রতিবেদন তৈরি করে সংশ্লিষ্ট উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের কমিটির মাধ্যমে অনুমোদনের প্রক্রিয়া এগোয়। সরকারি সেবা তথ্যেও কৃষি খাসজমির বন্দোবস্তের ক্ষেত্রে আবেদন, সরেজমিন যাচাই এবং উপজেলা ও জেলা কমিটির অনুমোদনের কথা উল্লেখ রয়েছে।
অকৃষি খাসজমির ক্ষেত্রে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে বন্দোবস্তের নথি প্রস্তুত করে প্রয়োজনীয় অনুমোদনের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ/ভূমি মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর প্রক্রিয়া থাকতে পারে।
ধাপে ধাপে কীভাবে খাস জমি নেওয়া যায়?
প্রথম ধাপ—জমি শনাক্তকরণ:
যে জমিটি নিতে চান সেটি সরকারি খাস জমি কি না এবং বন্দোবস্তযোগ্য কি না তা সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিসে যাচাই করুন।
দ্বিতীয় ধাপ—জমির তথ্য সংগ্রহ:
মৌজা, দাগ নম্বর, খতিয়ান, জমির শ্রেণি, পরিমাণ ও অবস্থান সম্পর্কে সঠিক তথ্য সংগ্রহ করুন।
তৃতীয় ধাপ—যোগ্যতা যাচাই:
আপনি কৃষি খাসজমির জন্য যোগ্য কি না অথবা আপনার প্রস্তাবটি অকৃষি খাসজমি বন্দোবস্তের আওতায় পড়ে কি না তা নিশ্চিত করুন।
চতুর্থ ধাপ—আবেদন:
প্রযোজ্য নিয়ম অনুযায়ী আবেদনপত্র, পরিচয়পত্র, প্রয়োজনীয় সনদ, অঙ্গীকারনামা এবং অন্যান্য কাগজপত্র জমা দিতে হবে।
পঞ্চম ধাপ—সরেজমিন তদন্ত:
কর্তৃপক্ষ জমির অবস্থান, দখল, শ্রেণি, সরকারি রেকর্ড এবং আবেদনকারীর যোগ্যতা যাচাই করতে পারে।
ষষ্ঠ ধাপ—কমিটি ও কর্তৃপক্ষের
অনুমোদন:
প্রযোজ্য ক্ষেত্রে উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে যাচাই-বাছাইয়ের পর প্রস্তাব অনুমোদনের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে যায়।
সপ্তম ধাপ—বন্দোবস্ত/লিজ আদেশ:
অনুমোদন পাওয়া গেলে নির্ধারিত শর্ত, মূল্য/সেলামি, খাজনা বা অন্যান্য সরকারি পাওনা পরিশোধের পর বন্দোবস্ত বা লিজসংক্রান্ত আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করতে হয়।
অষ্টম ধাপ—দখল ও ব্যবহার:
সরকারি আদেশে যে উদ্দেশ্যে জমি দেওয়া হয়েছে, জমিটি সেই উদ্দেশ্যেই ব্যবহার করতে হবে। অনুমোদন ছাড়া জমির ব্যবহার পরিবর্তন, হস্তান্তর বা অন্যের কাছে দেওয়া আইনগত জটিলতা তৈরি করতে পারে।
গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা
সরকারি খাস জমি নিয়ে অনেক সময় দালালচক্রের মাধ্যমে প্রতারণার অভিযোগ পাওয়া যায়। তাই কোনো ব্যক্তিকে টাকা দিয়ে ‘খাস জমি পাইয়ে দেওয়ার’ চুক্তি করা উচিত নয়।
শুধু সরকারি অফিস, সরকারি রসিদ এবং লিখিত আদেশের মাধ্যমে লেনদেন করুন।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—কেউ দীর্ঘদিন ধরে সরকারি খাস জমি দখল করে থাকলেই তিনি ওই জমির বৈধ মালিক বা লিজগ্রহীতা হয়ে যান না। বৈধ বন্দোবস্ত বা লিজের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ও সরকারি নথি প্রয়োজন।
কোথায় যোগাযোগ করবেন?
প্রথমে সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন ভূমি অফিস, উপজেলা ভূমি অফিস/সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয় এবং প্রয়োজনে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের ভূমি শাখায় যোগাযোগ করা যেতে পারে।
সরকারি নীতিমালা ও সেবার সর্বশেষ তথ্য দেখতে ভূমি মন্ত্রণালয়ের নীতিমালা পেজ ব্যবহার করা যায়। সেখানে কৃষি খাসজমি ব্যবস্থাপনা ও বন্দোবস্ত নীতিমালা, ১৯৯৭ এবং অকৃষি খাসজমি ব্যবস্থাপনা ও বন্দোবস্ত নীতিমালা, ১৯৯৫ তালিকাভুক্ত রয়েছে।
শেষ কথা
সরকারি খাস জমি লিজ বা বন্দোবস্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো জমিটি বন্দোবস্তযোগ্য কি না, আবেদনকারীর যোগ্যতা, জমি ব্যবহারের উদ্দেশ্য এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন। তাই নির্দিষ্ট জমির দাগ ও খতিয়ান নম্বর নিয়ে আগে ভূমি অফিসে যাচাই করে তারপর আবেদন করাই সবচেয়ে নিরাপদ পদ্ধতি।