সাংবাদিকতা: অনিয়মই যেখানে নিয়ম, আর ‘নাই’ যেখানে প্রাপ্তি

নিউজ ডেস্ক | news71.tv
আপডেট : ০৩ মে, ২০২৬
নিউজ সেভেন্টি ওয়ান ডট টিভি ডেস্ক
Ai

সাংবাদিকতা: অনিয়মই যেখানে নিয়ম, আর ‘নাই’ যেখানে প্রাপ্তি

জিতু রায়ঃ

রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে স্বীকৃত সাংবাদিকতা পেশাটি আজ এক অদ্ভুত গোলকধাঁধায় আটকে গেছে। একদিকে যেমন রয়েছে পেশাগত মর্যাদার চরম সংকট, অন্যদিকে কাঠামোগত অবহেলা আর নীতিমালার অভাবে এ পেশাটি এখন এক অনিয়ন্ত্রিত জনপদে পরিণত হয়েছে। সমসাময়িক প্রেক্ষাপটে সাংবাদিকদের জীবনের প্রাপ্তির খাতাটি যখন আমরা খুলি, তখন সেখানে শুধু ‘নাই’ আর ‘নাই’ এর দীর্ঘ দীর্ঘশ্বাস ছাড়া আর কিছুই খুঁজে পাওয়া যায় না। এই ‘নাই’ কেবল শব্দ নয়; এটি এক গভীর বঞ্চনার ইতিহাস।

 

যোগ্যতার মাপকাঠি ও অদ্ভুত বৈপরীত্য
আমাদের দেশে সাংবাদিকতায় যোগদানের ক্ষেত্রে কোনো সুনির্দিষ্ট মানদণ্ড বা অভিন্ন শিক্ষাগত যোগ্যতার বাধ্যবাধকতা নেই। মূলধারার প্রতিষ্ঠিত কিছু প্রতিষ্ঠান অভিজ্ঞ ও উচ্চশিক্ষিতদের নিয়োগ দিলেও, ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠা নামসর্বস্ব পত্রিকা বা অনলাইন টেলিভিশনগুলো কোনো প্রকার যাচাই-বাছাই ছাড়াই ‘প্রতিনিধি’ নিয়োগ দিচ্ছে। বিড়ম্বনা হলো, সাধারণ মানুষের কাছে উভয়ই ‘সাংবাদিক’।


এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরেকটি বড় ‘নাই’—সাংবাদিকদের কোনো জাতীয় তালিকা নাই। ফলে কে প্রকৃত সাংবাদিক আর কে নয়, তার সুনির্দিষ্ট সীমারেখা তৈরি হয়নি। এর বাস্তব প্রভাব দেখা যায় প্রতিদিন—কেউ ব্যক্তিস্বার্থে সাংবাদিক পরিচয় ব্যবহার করলে দায়টা পড়ে পুরো পেশার ওপর। ফলে প্রকৃত সাংবাদিকরা সামাজিকভাবে আস্থার সংকটে পড়ছেন। এর সাথে আরও স্পষ্ট হয়—সাংবাদিকতা পেশাকে সরকারি ফর্মে সুস্পষ্টভাবে স্বীকৃতি দেওয়ার ব্যবস্থা অনেক ক্ষেত্রে নাই, ফলে পেশার আনুষ্ঠানিক অবস্থানও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে থাকে।


এত গুরুত্বপূর্ণ একটি পেশাকে আমরা গুরুত্বপূর্ণ বলি—কারণ সমাজ ও রাষ্ট্রের নানা অনিয়ম, দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা তুলে ধরার দায়িত্ব একজন সংবাদকর্মীর। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, যিনি এই দায়িত্ব পালন করবেন, তার যোগ্যতা নির্ধারণের কোনো কার্যকর কাঠামো কি আছে? নিরাপত্তা বাহিনী থেকে শুরু করে সরকারি-বেসরকারি প্রতিটি চাকরিতেই নির্দিষ্ট নীতিমালা, যাচাই-বাছাই ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে নিয়োগ দেওয়া হয়। কারণ, নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি হয়ে জনসাধারণের সামনে দাঁড়ান।


কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে সাংবাদিকতা এমন একটি পেশা, যেখানে নিয়োগের সুনির্দিষ্ট বিধিমালা নাই, তদারকি নাই, অভিন্ন প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা নাই। মৌখিক কিছু নিয়ম থাকলেও তার বাস্তব প্রয়োগ বা নজরদারি নেই বললেই চলে। ফলে “সাংবাদিক” পরিচয়ে কে কাজ করছেন, তার দক্ষতা, নৈতিকতা বা দায়বদ্ধতা নির্ণয়ের কোনো একক মাপকাঠি নেই।


নিয়োগের নামে যে ‘ছলচাতুরি’
প্রতিষ্ঠিত হোক বা অখ্যাত—দেশের অধিকাংশ সংবাদমাধ্যম তাদের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে বেতন কাঠামোর উল্লেখ করে না। এখানে স্পষ্টভাবে আরেকটি ‘নাই’ চোখে পড়ে—নিয়োগ নীতিমালা নাই, নির্দিষ্ট বেতন নাই। জেলা বা উপজেলা পর্যায়ে অনেক প্রতিনিধি বছরের পর বছর কাজ করেও কোনো বেতন, ভাতা বা সম্মানী পান না।
বাস্তব উদাহরণ হলো—একজন জেলা প্রতিনিধি নিজের খরচে ঘটনাস্থলে যান, তথ্য সংগ্রহ করেন, ভিডিও ধারণ করেন, অথচ মাস শেষে তার প্রাপ্তি শূন্য। এতে করে যাতায়াত ভাতা নাই, বোনাস নাই, পেনশন নাই, বাড়ি ভাড়া সহায়তা নাই, চিকিৎসা ভাতা নাই—এই তালিকাটি কেবল কাগজে নয়, জীবনের বাস্তবতায় প্রতিফলিত হয়। ফলে তার পরিবারের জীবনযাত্রাও অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে। এই শূন্যতাই অনেক ক্ষেত্রে অপ-সাংবাদিকতার জন্ম দেয়।


‘নাই’ এর গভীর বিশ্লেষণ: 
কেন এই হাহাকার? আগে আলোচিত ২১টি ‘নাই’ এর তালিকাটি কেবল একগুচ্ছ শব্দ নয়, বরং এ দেশের গণমাধ্যমকর্মীদের শোষণের মানচিত্র।


আর্থিক শূন্যতা:
নির্দিষ্ট বেতন নাই, ভাতা নাই, চিকিৎসা সহায়তা নাই, বাড়িভাড়া সহায়তা নাই, যাতায়াত ভাতা নাই, বোনাস নাই, পেনশন নাই। একজন সাংবাদিক অসুস্থ হলে তার চিকিৎসার দায়ভার ব্যক্তিগত, প্রাতিষ্ঠানিক নয়। আবার দীর্ঘদিন কাজ করলেও নেই কোনো পেনশন ব্যবস্থা। সাংবাদিকদের সন্তানের লেখাপড়ার জন্য কোনো সরকারি সহায়তা নাই—যা পেশাটিকে আরও অনিশ্চিত করে তোলে।


নিরাপত্তাহীনতা:
সবচেয়ে বড় ‘নাই’—সাংবাদিক সুরক্ষা আইন নাই। বাস্তবে দেখা যায়, কোনো দুর্নীতি বা অনিয়মের বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশ করলেই শুরু হয় হামলা, মামলা, হুমকি, এমনকি গ্রেফতারের আশঙ্কা। অনেক ক্ষেত্রে দ্রুত বিচার আইনে মামলার মতো চাপও আসে। গ্রেফতার হলে জামিন প্রক্রিয়াও জটিল হয়ে দাঁড়ায়। সাংবাদিকদের হতাহতের ঘটনায় বিচার প্রক্রিয়া অনেক সময় ঝুলে থাকে—অর্থাৎ বিচার নিশ্চিত করার নিশ্চয়তাও নাই।
এছাড়া কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা নাই—সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে প্রতিনিয়ত ঝুঁকি নিতে হয়।


সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক অবহেলা:
একসময় কোনো সাংবাদিক হামলার শিকার হলে স্থানীয়ভাবে প্রতিরোধ গড়ে উঠত। এখন সেই চিত্র অনেকটাই বদলে গেছে। সামাজিকভাবে পাশে দাঁড়ানো নাই—বরং উল্টো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচার, ‘হলুদ সাংবাদিক’ তকমা, চরিত্র হননের প্রবণতা বেড়েছে। এছাড়া সরকারি ত্রাণ বা সহায়তা নাই, পেশাগত কাজে ব্যবহারের জন্য ক্যামেরা, ল্যাপটপ বা মোবাইল কেনার কোনো প্রণোদনা নাই।


মানবিক ও মর্যাদাগত শূন্যতা:
দীর্ঘদিন সাংবাদিকতা করার পর মৃত্যুকালে রাষ্ট্রীয় বা সামাজিক মর্যাদা অনেক ক্ষেত্রেই নাই। পরিবহন খাতে কোনো বিশেষ ছাড় নাই। ফলে পেশাটি সম্মানজনক হলেও বাস্তবতায় সেই সম্মানের প্রতিফলন খুব কম।


প্রযুক্তির চ্যালেঞ্জ ও আগামীর অন্ধকার
বর্তমান যুগে প্রযুক্তির জয়জয়কার। অনলাইন মাধ্যমগুলো এখন সংবাদের প্রধান উৎস হয়ে উঠছে। কিন্তু এখানেও বড় একটি ‘নাই’ কাজ করছে—প্রশিক্ষণ নাই, নিয়ন্ত্রণ নাই। ফলে যাচাই-বাছাই ছাড়া তথ্য ছড়িয়ে পড়ছে, যা সমাজে বিভ্রান্তি তৈরি করছে। মূলধারা সাংবাদিকতার সঙ্গে নামসর্বস্ব কনটেন্টের এই মিশ্রণ পেশার বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।


উত্তরণের পথ কী?
সরকার আসে, সরকার যায়; কিন্তু সাংবাদিকদের জন্য টেকসই নীতিমালা এখনো অধরা। এই ‘নাই’-এর সংস্কৃতি থেকে বের হতে হলে কিছু মৌলিক পদক্ষেপ জরুরি।


প্রথমত, একটি জাতীয় পর্যায়ের সাংবাদিক তালিকা প্রণয়ন করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, সুনির্দিষ্ট নিয়োগ ও বেতন কাঠামো নিশ্চিত করতে হবে।
তৃতীয়ত, সাংবাদিকদের জন্য কার্যকর সুরক্ষা আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে।
চতুর্থত, প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা বাড়াতে হবে, যাতে পেশার মান উন্নত হয়।


একটি বিষয় আজ স্পষ্ট—দেশ, সমাজ বা পরিবার যখন কোনো সংকটে পড়ে, তখন সবার দৃষ্টি গিয়ে পড়ে একজন সাংবাদিকের দিকে। যেকোনো পেশার মানুষই তখন একজন সাংবাদিকের সহযোগিতা চান। কিন্তু যিনি সহযোগিতা দেবেন, যিনি সত্য তুলে ধরবেন—তিনি কতটা যোগ্য, কতটা প্রশিক্ষিত, কতটা দায়বদ্ধ—তা নির্ধারণের কোনো সুস্পষ্ট ব্যবস্থা আজও গড়ে ওঠেনি। রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ যদি শুধু অভাব, মামলা আর নিরাপত্তাহীনতার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে, তবে সেই গণতন্ত্রের ভিত কখনোই মজবুত হবে না। ‘নাই’ এর তালিকা থেকে বেরিয়ে এসে সাংবাদিকদের জন্য একটি ‘আছে’র পৃথিবী গড়া এখন শুধু সময়ের দাবি নয়, বরং সাংবাদিকতার অস্তিত্ব রক্ষার একমাত্র পথ। কারণ, সাংবাদিকতা টিকে থাকলে সত্য টিকে থাকবে। আর সত্য টিকে থাকলেই টিকে থাকবে সমাজ ও রাষ্ট্রের ন্যায্যতা।